ঢাকা ১২:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
লগি-বৈঠা হামলায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে লাকসামে জামায়াতের বিক্ষোভ নয়নজলি ভরাট করে সরকারি সম্পত্তি দখল:  জব্দকৃত মাটি নিলামের ঘোষণা — ইউএনও’র  লাকসামের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এ কে এম ফজলুল হকের ইন্তেকাল মোহাম্মদপুরে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন পদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যকে র‍্যাংক ব্যাজ পরিধান কাশিমপুরে সুপ্রিম গার্মেন্টসের গোডাউনে ভয়াবহ আগুন, ৯ ইউনিটের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণ ঢাকা–কক্সবাজার রুটে মহানগর এক্সপ্রেস, লাকসামে যাত্রাবিরতি – লাকসামের জন্য টিকিট বাড়ানোর দাবি যাত্রীদের লাকসাম গাজীমুড়া দারুল কোরআন মাদ্রাসায় বার্ষিক মাহফিল, ৯ হাফেজকে পাগড়ি প্রদান ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান লাকসামে চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল ইসলামের সমর্থনে বিএনপির মতবিনিময় সভা লাকসামে শারদীয় দূর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসঃ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সবার সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা

৪১ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া মিলেনি ! বুড়িচংয়ে তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে !! জরাজীর্ণ ভবনে আতঙ্কে পাঠদান

কুমিল্লা প্রতিনিধি :
  • আপডেট সময় : ১০:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সময় যেখানে প্রতিদিন শত শত কিশোরীর পদচারণায় মুখর থাকত প্রাঙ্গণ, আজ সেখানে ভাঙা গেট, জরাজীর্ণ ভবন আর স্যাঁতসেঁতে দেয়াল যেন নীরবে কাঁদছে। যে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যন্ত জনপদের মেয়েদের হাতে
শিক্ষার আলো তুলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, চার দশকের বেশি সময় পর সেই বিদ্যালয়টিই যেন নিজেই অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছে।কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার এলাকার তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এমনই করুণ চিত্র। প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দের তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি বলে অভিযোগ শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের। একসময় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও নানা সংকটে বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করছে মাত্র ২৬০ জন।স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাতা দানবীর হাজী জুনাব আলী ও তাঁর পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকলে তার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের—এমন মন্তব্যও করেছেন স্থানীয়রা।নারী শিক্ষার বাতিঘর থেকে আজ অবহেলার প্রতিচ্ছবিশিক্ষার আলোয় পিছিয়ে থাকা জনপদকে এগিয়ে নিতে একে একে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন দানবীর হাজী জুনাব আলী। কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী বুড়িচং উপজেলার নিমসার এলাকার শিকারপুর গ্রামের এইস কৃতী সন্তান নিমসার জুনাব আলী কলেজ প্রতিষ্ঠার পর নজর দেন নারী শিক্ষার দিকে।তখন এ অঞ্চলের
প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের জন্য আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নারীদের এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সেই চিন্তা থেকেই ১৯৮৫ সালে তাঁর স্ত্রী তাহেরা জুনাব আলীর নামে প্রতিষ্ঠা করেন তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।প্রতিষ্ঠার পর বিদ্যালয়টি দ্রুতই এলাকার নারী শিক্ষার অন্যতম আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। একসময় এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। পরপর
কয়েক বছর শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে টানা শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করে। ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে মন্ত্রণালয় থেকেও পুরস্কার পেয়েছিল বিদ্যালয়টি।কিন্তু সাফল্যের সেই দিনগুলো আজ যেন অতীতের গল্প।হাজার থেকে ২৬০, ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীঅবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে শিক্ষার্থী। এক যুগ আগেও যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৬০ জনে।ভবন জরাজীর্ণ, শৌচাগারের সংকট, নেই পর্যাপ্ত লাইব্রেরি ও ক্যান্টিন। মাঠে পানি জমে থাকে দীর্ঘসময়। সব মিলিয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।ফলে একসময় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জনকারী বিদ্যালয়টির ফলাফলও এখন নিম্নমুখী। চলতি বছর ৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৯ জন।‘ভূমিকম্প হলে কী হবে’—আতঙ্কে শিক্ষার্থীরাসরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের গ্রিলের গেটটি ভাঙা। মূল গেটের এক পাশ ভেঙে পড়ে আছে। বিদ্যালয়ের মাঠে জমে আছে পানি।পুরোনো দোতলা ভবনের নিচতলার বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার উঠে গেছে। কোথাও চুন-সুরকি খসে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব। কোনো কোনো স্থান দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ার চিহ্নও রয়েছে। কয়েকটি কক্ষে নেই পর্যাপ্ত পাখার ব্যবস্থা।জরাজীর্ণ ভবনটির দিকে তাকালে মনে হয়, দীর্ঘদিন ধরে যেন কোনো যত্নের হাত পড়েনি। অথচ এই ভবনের ভেতরেই প্রতিদিন স্বপ্ন বুনছে শত শত কিশোরী।শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার, মারিয়া ইসলাম শারাপোভা ও জান্নাতুল নূর বলেন, ক্লাসে কখনো পানি চুঁইয়ে পড়ে, আবার কখনো চুন-সুরকি খসে পড়ে। ভূমিকম্প হলে আমরা আতঙ্কে থাকি—কখন না জানি ভবনটি ভেঙে পড়ে। ওয়াশরুমের অবস্থাও খারাপ। স্কুলে নতুন ভবনের পাশাপাশি লাইব্রেরি ও ক্যান্টিন স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে।”তাদের কণ্ঠে ভয়, চোখে অনিশ্চয়তা। অথচ নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ পাওয়াটা তাদের কাছে কোনো বিলাসিতা নয়—এটি তাদের ন্যায্য অধিকার।আবেদন করেও মেলেনি প্রতিকারসহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ুআমাদের স্কুলটি এই মফস্বল এলাকায় ভালো সুনাম নিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে নানা সংকটে সেটি পিছিয়ে পড়ছে। এতে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। স্কুলের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।”সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহীন আক্তার বলেন, ুদানবীর জুনাব আলী স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর এখানে সরকারের কোনো নজর পড়েনি। এটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। আমরা নতুন ভবনের জন্য বারবার আবেদন করেও কোনো সাড়া পাইনি।”৪১ বছরে উন্নয়ন কোথায়?বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্থানীয় নিমসারের বাসিন্দা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. আব্দুল ওহাব মাস্টার ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।তাঁর কর্মকালেও ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারি বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রায় ২২ লাখ টাকার একটি ভবনের প্রস্তাব করা হলেও সেটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কুমিল্লা-৫ আসনে এডভোকেট আবুল হাসেম খান ও আবু জাহের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও বিদ্যালয়টির ভাগ্যে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আসেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিদ্যালয়ের জন্য চারতলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হলেও সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।নিজের অর্থে এগিয়ে এলেন প্রতিষ্ঠাতার ছেলেবিদ্যালয়ের এই দুরবস্থা দেখে বসে থাকেননি প্রতিষ্ঠাতা হাজী জুনাব আলীর ছেলে গোলাম সারওয়ার। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কারে হাত বাড়িয়েছেন তিনি।শুধু সংস্কারই নয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নিজ অর্থায়নে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অডিটোরিয়াম নির্মাণের কাজও শুরু করেছেন গোলাম সারওয়ার।স্থানীয়দের মতে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাময়িকভাবে কিছুটা সংকট কমানো গেলেও এত বড় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ ও যথাযথ বরাদ্দ।ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুনাব আলীর নাম১৯৭৯ সালে নিমসার জুনাব আলী কলেজ মাঠে বিশাল জনসভায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বদলীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন হাজী জুনাব আলী।পরে ১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের রানীর বাংলোয় এলে হাজী জুনাব আলী তাঁর সামনে এলাকার বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন—ুডাল-ভাত খেতে চাই, ময়নামতি থানা চাই এবং নিমসার জুনাব আলী কলেজকে জাতীয়করণ চাই।”সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এসব দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এর মধ্যে নিমসার জুনাব আলী কলেজ জাতীয়করণের দাবি বাস্তবায়িত না হলেও তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে মহাবিদ্যালয়ে উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান।কিন্তু পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের  সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বপনকে ম্যানেজ করে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আনোয়ারা বেগম নিয়োগ পান। তাঁর নিয়োগের পর থেকেই বিদ্যালয়টির অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।সূত্রটির আরও অভিযোগ, ওই সময় রাজনৈতিক শেল্টার পেয়ে বিদ্যালয়ে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আনোয়ারা বেগম বলেন আওয়ামী লীগে সরকারের সদয় আমি প্রশাসনের  সর্বত্র   গিয়েছি স্কুলের উন্নয়নের জন্য। কিন্তু সব জায়গায় বলছেন জুনাব আলীর পরিবার বিএনপির। এ বলে আমাদের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখত।আমাদের সাংঘর্ষিক দূর অবস্থা চলছে। অভিযোগের বিষয়ে বলেন  আওয়ামী লীগের সাজ্জাদ হোসেন চেয়ারম্যানের কোন সহযোগিতা নেই নি। আমি যথাযথ ভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম হয়ে নিয়োগ পেয়েছি। স্কুলের কোন ইনকাম নেই আমি অনিয়ম করব কোথায়। এগুলো সব মিথ্যা সত্যি না। শিক্ষা বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজনস্থানীয় অভিভাবকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি পুরোনো ভবনের গল্প নয়; এটি একটি জনপদের মেয়েদের শিক্ষার ভবিষ্যতের গল্প। যে প্রতিষ্ঠানটি একসময় হাজারো মেয়ের স্বপ্নের ঠিকানা ছিল, সেটি আজ শিক্ষার্থী হারাচ্ছে, হারাচ্ছে তার পুরোনো গৌরব।একদিকে জরাজীর্ণ ভবন, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া ও ফলাফল নিম্নমুখী হওয়ার বাস্তবতা।এভাবে চলতে থাকলে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি আরও পিছিয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কা অভিভাবক ও স্থানীয়দের।বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবদুল মান্নান বলেন, ুস্কুলটির সংস্কারের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, কাজে হাত দিতে পারবো। তবে নতুন ভবনের বিষয়টি এমপি মহোদয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।”স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে বিদ্যালয়টির দিকে এখনই নজর দিতে হবে। কারণ একটি জরাজীর্ণ ভবনের নিচে শুধু ইট-পাথর নয়, প্রতিদিন চাপা পড়ে যাচ্ছে শত শত কিশোরীর নিরাপত্তা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

৪১ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া মিলেনি ! বুড়িচংয়ে তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে !! জরাজীর্ণ ভবনে আতঙ্কে পাঠদান

আপডেট সময় : ১০:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সময় যেখানে প্রতিদিন শত শত কিশোরীর পদচারণায় মুখর থাকত প্রাঙ্গণ, আজ সেখানে ভাঙা গেট, জরাজীর্ণ ভবন আর স্যাঁতসেঁতে দেয়াল যেন নীরবে কাঁদছে। যে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যন্ত জনপদের মেয়েদের হাতে
শিক্ষার আলো তুলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, চার দশকের বেশি সময় পর সেই বিদ্যালয়টিই যেন নিজেই অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছে।কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার এলাকার তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এমনই করুণ চিত্র। প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দের তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি বলে অভিযোগ শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের। একসময় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও নানা সংকটে বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করছে মাত্র ২৬০ জন।স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাতা দানবীর হাজী জুনাব আলী ও তাঁর পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকলে তার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের—এমন মন্তব্যও করেছেন স্থানীয়রা।নারী শিক্ষার বাতিঘর থেকে আজ অবহেলার প্রতিচ্ছবিশিক্ষার আলোয় পিছিয়ে থাকা জনপদকে এগিয়ে নিতে একে একে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন দানবীর হাজী জুনাব আলী। কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী বুড়িচং উপজেলার নিমসার এলাকার শিকারপুর গ্রামের এইস কৃতী সন্তান নিমসার জুনাব আলী কলেজ প্রতিষ্ঠার পর নজর দেন নারী শিক্ষার দিকে।তখন এ অঞ্চলের
প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের জন্য আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নারীদের এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সেই চিন্তা থেকেই ১৯৮৫ সালে তাঁর স্ত্রী তাহেরা জুনাব আলীর নামে প্রতিষ্ঠা করেন তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।প্রতিষ্ঠার পর বিদ্যালয়টি দ্রুতই এলাকার নারী শিক্ষার অন্যতম আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। একসময় এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। পরপর
কয়েক বছর শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে টানা শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করে। ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে মন্ত্রণালয় থেকেও পুরস্কার পেয়েছিল বিদ্যালয়টি।কিন্তু সাফল্যের সেই দিনগুলো আজ যেন অতীতের গল্প।হাজার থেকে ২৬০, ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীঅবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে শিক্ষার্থী। এক যুগ আগেও যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৬০ জনে।ভবন জরাজীর্ণ, শৌচাগারের সংকট, নেই পর্যাপ্ত লাইব্রেরি ও ক্যান্টিন। মাঠে পানি জমে থাকে দীর্ঘসময়। সব মিলিয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।ফলে একসময় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জনকারী বিদ্যালয়টির ফলাফলও এখন নিম্নমুখী। চলতি বছর ৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৯ জন।‘ভূমিকম্প হলে কী হবে’—আতঙ্কে শিক্ষার্থীরাসরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের গ্রিলের গেটটি ভাঙা। মূল গেটের এক পাশ ভেঙে পড়ে আছে। বিদ্যালয়ের মাঠে জমে আছে পানি।পুরোনো দোতলা ভবনের নিচতলার বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার উঠে গেছে। কোথাও চুন-সুরকি খসে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব। কোনো কোনো স্থান দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ার চিহ্নও রয়েছে। কয়েকটি কক্ষে নেই পর্যাপ্ত পাখার ব্যবস্থা।জরাজীর্ণ ভবনটির দিকে তাকালে মনে হয়, দীর্ঘদিন ধরে যেন কোনো যত্নের হাত পড়েনি। অথচ এই ভবনের ভেতরেই প্রতিদিন স্বপ্ন বুনছে শত শত কিশোরী।শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার, মারিয়া ইসলাম শারাপোভা ও জান্নাতুল নূর বলেন, ক্লাসে কখনো পানি চুঁইয়ে পড়ে, আবার কখনো চুন-সুরকি খসে পড়ে। ভূমিকম্প হলে আমরা আতঙ্কে থাকি—কখন না জানি ভবনটি ভেঙে পড়ে। ওয়াশরুমের অবস্থাও খারাপ। স্কুলে নতুন ভবনের পাশাপাশি লাইব্রেরি ও ক্যান্টিন স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে।”তাদের কণ্ঠে ভয়, চোখে অনিশ্চয়তা। অথচ নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ পাওয়াটা তাদের কাছে কোনো বিলাসিতা নয়—এটি তাদের ন্যায্য অধিকার।আবেদন করেও মেলেনি প্রতিকারসহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ুআমাদের স্কুলটি এই মফস্বল এলাকায় ভালো সুনাম নিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে নানা সংকটে সেটি পিছিয়ে পড়ছে। এতে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। স্কুলের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।”সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহীন আক্তার বলেন, ুদানবীর জুনাব আলী স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর এখানে সরকারের কোনো নজর পড়েনি। এটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। আমরা নতুন ভবনের জন্য বারবার আবেদন করেও কোনো সাড়া পাইনি।”৪১ বছরে উন্নয়ন কোথায়?বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্থানীয় নিমসারের বাসিন্দা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. আব্দুল ওহাব মাস্টার ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।তাঁর কর্মকালেও ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারি বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রায় ২২ লাখ টাকার একটি ভবনের প্রস্তাব করা হলেও সেটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কুমিল্লা-৫ আসনে এডভোকেট আবুল হাসেম খান ও আবু জাহের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও বিদ্যালয়টির ভাগ্যে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আসেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিদ্যালয়ের জন্য চারতলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হলেও সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।নিজের অর্থে এগিয়ে এলেন প্রতিষ্ঠাতার ছেলেবিদ্যালয়ের এই দুরবস্থা দেখে বসে থাকেননি প্রতিষ্ঠাতা হাজী জুনাব আলীর ছেলে গোলাম সারওয়ার। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কারে হাত বাড়িয়েছেন তিনি।শুধু সংস্কারই নয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নিজ অর্থায়নে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অডিটোরিয়াম নির্মাণের কাজও শুরু করেছেন গোলাম সারওয়ার।স্থানীয়দের মতে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাময়িকভাবে কিছুটা সংকট কমানো গেলেও এত বড় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ ও যথাযথ বরাদ্দ।ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুনাব আলীর নাম১৯৭৯ সালে নিমসার জুনাব আলী কলেজ মাঠে বিশাল জনসভায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বদলীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন হাজী জুনাব আলী।পরে ১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের রানীর বাংলোয় এলে হাজী জুনাব আলী তাঁর সামনে এলাকার বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন—ুডাল-ভাত খেতে চাই, ময়নামতি থানা চাই এবং নিমসার জুনাব আলী কলেজকে জাতীয়করণ চাই।”সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এসব দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এর মধ্যে নিমসার জুনাব আলী কলেজ জাতীয়করণের দাবি বাস্তবায়িত না হলেও তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে মহাবিদ্যালয়ে উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান।কিন্তু পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের  সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বপনকে ম্যানেজ করে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আনোয়ারা বেগম নিয়োগ পান। তাঁর নিয়োগের পর থেকেই বিদ্যালয়টির অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।সূত্রটির আরও অভিযোগ, ওই সময় রাজনৈতিক শেল্টার পেয়ে বিদ্যালয়ে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আনোয়ারা বেগম বলেন আওয়ামী লীগে সরকারের সদয় আমি প্রশাসনের  সর্বত্র   গিয়েছি স্কুলের উন্নয়নের জন্য। কিন্তু সব জায়গায় বলছেন জুনাব আলীর পরিবার বিএনপির। এ বলে আমাদের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখত।আমাদের সাংঘর্ষিক দূর অবস্থা চলছে। অভিযোগের বিষয়ে বলেন  আওয়ামী লীগের সাজ্জাদ হোসেন চেয়ারম্যানের কোন সহযোগিতা নেই নি। আমি যথাযথ ভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম হয়ে নিয়োগ পেয়েছি। স্কুলের কোন ইনকাম নেই আমি অনিয়ম করব কোথায়। এগুলো সব মিথ্যা সত্যি না। শিক্ষা বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজনস্থানীয় অভিভাবকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি পুরোনো ভবনের গল্প নয়; এটি একটি জনপদের মেয়েদের শিক্ষার ভবিষ্যতের গল্প। যে প্রতিষ্ঠানটি একসময় হাজারো মেয়ের স্বপ্নের ঠিকানা ছিল, সেটি আজ শিক্ষার্থী হারাচ্ছে, হারাচ্ছে তার পুরোনো গৌরব।একদিকে জরাজীর্ণ ভবন, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া ও ফলাফল নিম্নমুখী হওয়ার বাস্তবতা।এভাবে চলতে থাকলে নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি আরও পিছিয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কা অভিভাবক ও স্থানীয়দের।বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবদুল মান্নান বলেন, ুস্কুলটির সংস্কারের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, কাজে হাত দিতে পারবো। তবে নতুন ভবনের বিষয়টি এমপি মহোদয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।”স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে বিদ্যালয়টির দিকে এখনই নজর দিতে হবে। কারণ একটি জরাজীর্ণ ভবনের নিচে শুধু ইট-পাথর নয়, প্রতিদিন চাপা পড়ে যাচ্ছে শত শত কিশোরীর নিরাপত্তা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।